চট্টগ্রামের ইতিহাসে জীবন্ত-কিংবদন্তি বিশ্ববিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন
♦ লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য ♦
ড. অনুপম সেন। চট্টগ্রামের খ্যাতিনামা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য। তিনি আমাদের চট্টগ্রামের কৃতিপুরুষ। বৃহত্তর চট্টগ্রাম দক্ষিণের পটিয়া উপজেলায় তাঁর জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে ১৯৪৪ সালে ড. অনুপম সেনের জন্ম পটিয়া উপজেলায়। একটা জীবন যিনি কাটিয়ে দিলেন শিক্ষকতাকে ভালোবেসে। তিনি আমাদের চট্টগ্রাম শহরের শিক্ষা সংস্কৃতির অভিভাবক, এ নগরের বটবৃক্ষ ড. অনুপম সেন। আমাদের মনন-চেতনার প্রতীকপুরুষ। আমাদের মুগ্ধতার আরেক না, যাঁকে আমরা ‘অনুপম স্যার’ নামেই চিনি। মানব জীবনের সবকটি গুণাবলীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল ব্যক্তিত্ব ও মানবতা। মানবিকগুণে গুণান্বিত ব্যক্তিই মানবতার ধারক ও বাহক। অনুপম স্যার আজীবন মানুষের শুভ, কল্যাণ ও মানবিক চেবতনায় আস্থাশীল। ড. অনুপম স্যার সম্পর্কে দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের একটি প্রবন্ধে ব্যাপক তথ্য পাওয়া যায়। প্রবন্ধটিতে বলা হয়, “মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও উদার মানবিকতাবোধই তাঁর জীবনদর্শন। এই মানবাধিকারের সুরক্ষায় অনুপম সেন জাত-পাত-বর্ণ-সম্প্রদায় দেশ-বিদেশের ভৌগোলিক কোনো বিভাজন মান্য করেন না। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাইÑএটাই তাঁর জীবনের দর্শন। আজীবন শব্দযোদ্ধা, অসামন্য জীবনশিল্পী, অনুপম স্যারের কর্ম ও কৃতির সীমানা কতটা বিস্তৃত, তিনি বিশ্বসাহিত্য, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতিকে কতটা উপলব্ধি করেন, তাঁর মৌলিক রচনা ও গবেষণালব্ধ ফসল পাঠ না করলে জানা যাবে না। তাঁর সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য ও গভীর জীবনানুধ্যান আমাদের কতটা পথ দেখায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একারণেই তিনি হয়ে উঠেছেন রেনেসাঁস পুরুষ। এমন একজন রেনেসাঁস মানুষ রাষ্ট্র ও জাতির জন্য খুব বেশি অপরিহার্য। একাত্তরের বিরোধী শক্তির পাশাপাশি চিরকালের ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের চেতনাকে শাণিত করে যাঁরা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে আসছেন, তাঁদের মধ্যে তিনির অন্যতম। আমরা আমাদের প্রয়োজনেই তাঁকে চিরদিন হৃদয়ে ধারণ করে রাখতে পারি।
চিরকাল প্রসন্ন থাকাটাও একজন মানুষের পক্ষে খুব দুরূহ। আমরা তাঁকে কখনোই অপ্রসন্ন হতে দেখিনি! তিনি চির কোমল কৌলীন্য মানুষ। আর এ জন্যই হয়তো সার্বক্ষণিক কর্মধারার প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তিরও কোনো কমতি দেখি না তাঁর মধ্যে। তাঁর মেধা ও পরিশ্রমের সঙ্গে এক অসাধারণ যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে তাঁর কর্মক্ষেত্রে, যে যোগসূত্র দিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্রোতধারাকেও তিনি বেগবান করে চলেছেন। তিনি সরাসরি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শে প্রগতিশীল। একাধারে তিনি সমাজতাত্ত্বিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাহিত্য সমালোচক, সাহিত্য ও রাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক। শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী এই মানুষটির চেহারা চরিত্র যেন নিখুঁত এক জীবন্ত সংস্কৃতি। জ্ঞানার্জন আর মনুষ্যত্বের বিবেচনায় তিনি আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার এক মহৎ মানুষে পরিণত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জটিল সুবিধাবাদী চক্রের কূট পরিস্থিতির সাথে কখনো আঁতাত কিংবা সমঝোতার জন্য কখনো স্বীয় রাজনৈতিক ভাবনা, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি আজীবন পড়াশোনায় মগ্ন থেকে শিল্প-সাহিত্য ও সমাজের সকল অঙ্গনে বিচরণ করেছেন। তাঁর অধ্যয়নে বিরাম নেই। তাঁকে দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না যে তিনি কেবল সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক, তাঁর ইতিহাসজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান ও পাণ্ডিত্য মুগ্ধ করার মতো। একজন নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে সুস্থ-সুন্দর জীবনের অপরাজেয় যোদ্ধা হিসেবে, বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির সাধক হিসেবে, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের কারিগর হিসেবে যথার্থ গুণী মানুষ তিনি। মার্জিত রুচি, মনে-প্রাণে রাবীন্দ্রিক, আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও গবেষণায় নীলকণ্ঠ পাখি। একদিকে তিনি একজন মূলধারার অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্পকলাসহ জ্ঞানের সকল শাখায় বিশ্ববরেণ্য জ্ঞানদীপ্ত সাধক অন্যদিকে চলনে বলনে খাঁটি বাঙালি, খাঁটি মাতৃভাষা চর্চাকারী।” প্রবন্ধটিতে আরো বলা হয়, “মানবজীবন, জীবনসৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আদর্শ, মানব মর্যাদা প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর চিন্তার বিচিত্রগামিতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর ব্যক্তি জীবনে যেমন, তেমনি তাঁর সৃজনশীল ও মননশীল বইগুলোতে। অনুরঞ্জিত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তি ও সমাজই মানব জীবনে সার্থকতা অর্জন করতে পারে। এই বিশ্বাসের বশে তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে সমাজ ও সমাজের মানুষকে আলোকিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। সৃষ্টিধর্মী লেখা, মননশীলতা ও বহুমাত্রিকতার কারণে তাঁর সমসাময়িকদের মাঝে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর তিতিক্ষা ও বর্ণাঢ্য জীবন ইতিহাস আমাদের গৌরবের অনন্য পটভূমি। জ্ঞান ও কর্ম সাধনায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি জাতীয় ব্যক্তিত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। ব্যক্তিজীবনে শিক্ষাবিদ অনুপম সেন শিশুর মত সরল, যুবকের মত কর্মচঞ্চল, ঋষির মত প্রাজ্ঞ, কর্মপ্রাণ নীতিনিষ্ঠ। সদাহাস্যোজ্জ্বল, মিতভাষী, অনুকরণীয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনার জগতে প্রবাদতুল্য, নির্মোহ, নিরহংকার, প্রতিবাদী লেখায় ও বলায় সমান পারদর্শী, জাতির দুঃসময়ে অভয়বাণী শোনাবার মত মহান পথপ্রদর্শক, জাতির বিবেক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় অনুপম সেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত। তিনি গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী। দেশের যেকোনো সংকটাপন্ন মুহূর্তে প্রতিবাদী এ দার্শনিক গণতন্ত্রের পতাকা সমুন্নত রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আমাদের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে আছে। তিনি যতটা না একজন আদর্শ শিক্ষক তার চেয়ে একজন তুখোড় বক্তা। যাঁর বাক-ভক্সিমায় আমাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তিনি আমাদের প্রিয় মানুষ, বাংলাদেশের শিক্ষিত সচেতন মানুষের প্রতিনিধি। মানুষের মুক্তির মূল্যবোধ কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না। অনুপম সেন আমাদের কাছে সেই মূল্যবোধের অনিঃশেষ অভিযাত্রা, প্রাত্যহিক নগর প্রতীতি, আদর্শ মানুষের মূর্তমান মনীষা।” বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’ দিয়ে এই মহামানবকে সম্মানীত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও স্যারের জীবন ও সাধনাকে মূল্যায়ন করে সিটি কর্পোরেশন ‘অমর একুশে’ পুরস্কার প্রদান করেছে। বাঙালি ও চট্টগ্রামের ইতিহাসে ড. অনুপম সেন একজন পর্বতসমতুল্য বাঙালি। এই মহান মানুষের কারণে চট্টগ্রামের মানুষ গর্বিত ও ধন্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও লেখক।