ফণীর প্রভাব: চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ
সফিউল আলম: অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারির পর চট্টগ্রাম সুমদ্রবন্দরে নিজস্ব আ্যালার্ট থ্রি জারি করা হয়েছে। এরমধ্যে লাইটারেজ কোনো জাহাজ কর্ণফুলী নদী থেকে বঙ্গোপসাগরে বর্হিনোঙ্গরে যাচ্ছে না। ঝুঁকি এড়াতে বন্দরের জেটি থেকে সব জাহাজ বর্হিনোঙ্গরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। জেটিতে ক্রেনসহ কন্টেইনার ও পণ্য ওঠানামায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম সুরক্ষার আদেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
নৌ-বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিমান উঠানামা স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান বন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার এবিএম সারওয়ার-ই-জাহান। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও ২৭৩৯টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন। এছাড়া ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে জেলা সিভিল সার্জন।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারির পর বন্দরের নিজস্ব অ্যালার্ট-থ্রি জারি করা হয়েছে। এই অ্যালার্টের আওতায় জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
জাহাজগুলোকে জেটি ছাড়তে বলা হয়েছে। আর জেটিতে বন্দরের যেসব ইক্যুইপমেন্ট আছে সেগুলোকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা সুরক্ষার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবোঝাই জাহাজ রয়েছে ৮০টি। ১৬টি জাহাজ জেটিতে পণ্য খালাসের জন্য নোঙর করা ছিল। ৬৪টি জাহাজ বর্হিনোঙরে রয়েছে। ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারির পর জেটি থেকে ১৬টি জাহাজকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। বন্দরের জেটিতে ও সংলগ্ন ইয়ার্ডে কন্টেইনার থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাইয়ে যেসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, কন্টেইনার মুভার ইতোমধ্যে ঢুকে গেছে সেগুলোকেও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়েছে।
সচিব বলেন, যেসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্দরে ঢুকে গেছে, তাদের কাজ আমরা বন্ধ করিনি। তাদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে বলেছি। যদি ঘূর্ণিঝড় আরও তীব্র হয়, তখন তাদের কাজও বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে নতুন করে কোনো ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্দরে এই মুহূর্তে না ঢোকানোর সিদ্ধান্ত আছে।
এর আগে সকালে নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস থেকে আবহাওয়ার সতর্কবাণী চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে দেয়ার কথা জানান আবহাওয়াবিদ শ্রীকান্ত কুমার বসাক। সতর্কবার্তায় বলা হয়, সাগর এই মুহূর্তে খুবই উত্তাল আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ উপকূলবর্তী ১৪টি জেলার চরসংলগ্ন সাগরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হতে পারে। এতে জেলাগুলো প্লাবিত হতে পারে।
সাগর উত্তাল থাকায় লাইটারেজ জাহাজ, মাছ ধরার ট্রলার-ছোট জাহাজ, সাধারণ নৌকাসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের যুগ্ম পরিচালক হাজী শফিক আহমেদ জানান, বন্দরের বর্হিনোঙরে কোনো লাইটারেজ জাহাজ যাচ্ছে না। বর্হিনোঙরে মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য ওঠানামা বন্ধ আছে। কর্ণফুলী নদীতে এবং বিভিন্ন ঘাটে বৃহসপতিবার সকাল পর্যন্ত একশরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ অবস্থান করছে।
এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরার নৌযানগুলোকে তীরে এনে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। প্রায় ২০০ মাছ ধরার নৌযান এখন কর্ণফুলী নদীতে অবস্থান করছে।
এদিকে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জানিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য মোকাবিলার জন্য সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের আশ্রয় কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা ও পাহাড়ে বসবাসকারী লোকজনকে সওে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত খাবার মজুদ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় দুই হাজার ৭৩৯টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক। প্রতিটি উপজেলায় আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও সম্ভাব্য উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য শুকনো খাবারও মজুদ রাখতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, উপকূলীয় উপজেলাগুলোর মধ্যে সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, মিরসরাই ও আনোয়ারায় মাইকিং চলছে। লোকজনকে সাইক্লোন সেন্টারে চলে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। ক্ষেতে পাকা ধান থাকলে সেগুলো কেটে ফেলার জন্য চাষিদের বলা হয়েছে।
এদিকে, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ উপজেলায় ৫টি করে ৭০টি, ২০০ ইউনিয়নে ১টি করে মোট ২০০টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৫টি এবং নগরে আরও ৯টি আরবান ডিসপেনসারি টিম গঠন করে তাদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রতিটি টিমে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট মিলিয়ে তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। মোট ৮৫২ জন টিমের সদস্যকে সম্ভাব্য দুর্যোগসহ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া, ৯ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ওষুধ এবং সাড়ে ৪ লাখ ওরস্যালাইনও মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার এবিএম সারওয়ার-ই-জাহান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণি প্রভাবকে মনিটরিং করা হচ্ছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় শাহ আমানত বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে। তবে বিমান বন্দরের কার্যক্রম এখনও স্বাভাবিক গতিতে চলছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর সমূহ : চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর- ০৩১-৬৩৪৮৪৩। সিএমপি সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর- ০১৬৭৬-১২৩৪৫৬, ০১৬৭৯-১২৩৪৫৬, ০১৯৮০-৫০৫০৫০, ০১৭৩৩-২১৯১১৯, ০৩১-৬৩৯০২২, ০৩১-৬৩০৩৫২, ০৩১-৬৩০৩৭৫।