--- বিজ্ঞাপন ---

এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর

0

 

মানুষের ক্রয়-ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামো খাতে সরকারের বিভিন্ন মহাপরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশে আমদানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অন্যদিকে পোশাকসহ অনেকগুলো খাতে রপ্তানির ঊর্ধ্বগতিও দৃশ্যমান। এই আমদানি-রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর। বিশ্বের বন্দরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এখন ৭০ তম। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৯৫ তম। এক দশকের ব্যবধানে বন্দর এগিয়েছে ২৫ ধাপ। পণ্য পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধিই তালিকায় এগিয়ে যাওয়ার বড় কারণ।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কনটেইনার ওঠানামায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে সোয়া ১২ শতাংশ আর সাধারণ পণ্য ওঠানামায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে সোয়া ১৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যভর্তি ও খালি কনটেইনার মিলিয়ে ২৮ লাখ আট হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা হয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ তিন হাজার একক। কনটেইনার ওঠানামা বেড়েছে তিন লাখ পাঁচ হাজার একক আর গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দরের ৩০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে এই প্রবৃদ্ধি। জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালট্যান্সি (এইচপিসি) প্রণীত মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১৮ সালে কনটেইনার ওঠানামা হবে প্রায় ২৪ লাখ একক; ২০১৯ সালে হবে ২৬ লাখ ৬৬ হাজার একক এবং ২০২০ সালে হবে ২৯ লাখ একক কনটেইনার। আড়াই বছর পরের সেই পূর্বাভাস বা লক্ষ্যমাত্রা এখনই পূরণ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সমুদ্র পথে কনটেইনার পরিবহনের ৯৮ শতাংশই আনা-নেয়া করা হয় এই বন্দর দিয়ে। ফলে সা¤প্রতিক বছরগুলোতে কার্গো ও কনটেইনার পরিবহন বেড়ে গেছে বহুগুণ। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দরে সবচেয়ে বড় ও আধুনিক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) জন্য চীন থেকে জাহাজে করে তিনটি গ্যান্ট্রি ক্রেন গত ১৩ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। ১৩ বছর পর এই প্রথম গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো বন্দরের যন্ত্রপাতির বহরে যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া আরও তিনটি গ্যান্ট্রি ক্রেন আগামী দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে আসার কথা রয়েছে। এর ফলে বন্দরের পণ্য ওঠানামা বৃদ্ধি পাবে।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর ছয়টি গ্যান্ট্রি ক্রেন কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৪৫ কোটি টাকায় চীনের ‘সাংহাই জেনহুয়া হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড’ থেকে এই গ্যান্ট্রি ক্রেন কেনা হয়। ছয়টি গ্যান্ট্রি ক্রেনই সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ পায় সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রতি বছরই বাড়ছে আমদানি-রফতানির পরিমাণ। তিনটি গ্যান্ট্রি ক্রেন চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে- এটা বন্দরের জন্য বড় সুখবর। এসব চালু করতে কিছুদিন সময় লাগবে। আরও তিনটি গ্যান্ট্রি ক্রেন দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। মোট ছয়টি গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হবে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে। এতে বন্দরের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে স্বল্প মেয়াদী ১৪টি প্রকল্প নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরমধ্যে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রæতগতিতে চলছে। নিউমুরিং এলাকায় ওভার ফ্লো ইয়ার্ড নির্মাণ ও ৭নং খালের পাশে কন্টেইনার ইয়ার্ড-ওভার ফ্লো-ইয়ার্ড নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে। এ ছাড়া স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় অন্য যেসব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- সার্ভিস জেটি নির্মাণ প্রকল্প, লাইটারেজ জেটি নির্মাণ প্রকল্প, জেটি এলাকায় আরসিসি ইয়ার্ড নির্মাণ প্রকল্প, ভিডিও সার্ভিলেন্স সিস্টেম প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি, সার্ভিস ভেসেলস- টাগ বোট, পাইলট ভেসেলস, মুরিং লঞ্চ ইত্যাদি সংগ্রহ এবং অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ, জেটি ও টার্মিনালগুলোর জন্য ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ, ড্রেজার সংগ্রহ, সার্ভে ভেসেলস সংগ্রহ ও টাইড হাউস নির্মাণ, মহেশখাল ও মাতারবাড়ী এবং কুতুবদিয়াতে পোর্ট লিমিট বৃদ্ধি, সিটিএমএস টাওয়ার নির্মাণ, দুটি কাটার সাকশন ড্রেজার সংগ্রহ।
বন্দর উন্নয়নে মধ্য মেয়াদী প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- বে-টার্মিনাল নির্মাণ (১ম পর্যায়), ওয়ানস্টপ সার্ভিস বাড়ানো, টাগ বোট, পাইলট ভেসেলস, ওয়াটার বার্জ, বয়া লিফটিং ভেসেলস ইত্যাদি সংগ্রহ, জেটি ও টার্মিনালগুলোর জন্য ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ, বন্দরের জিসিবি এলাকায় ৯-১৩ নং জেটিতে কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে লালদিয়া মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ, রেজু খাল প্রকল্প, স্ট্র্যাটেজিক ফ্ল্যোটিং হার্বার স্থাপন প্রকল্প ও ভিটিএমআইএস বর্ধিতকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প। বন্দরের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহারও বাড়ছে। বন্দরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বন্দরের মূল অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও জোর গতিতে চলছে। তিনটি গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়েছে। পতেঙ্গায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণের কাজও চলছে। আগামী বছরের লয়েডস লিস্টের তালিকায় অবশ্যই আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে চট্টগ্রাম বন্দর।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য দ্রæত হারে বাড়ছে। ২০২১ সাল নাগাদ শুধু পোশাক রফতানি থেকেই ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম দ্বিগুণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দ্রæত সময়ের মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রæত বাস্তবায়ন কাজ শুরু করতে হবে।###

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.