--- বিজ্ঞাপন ---

রোহিংগা সমস্যার শেষ কোথায় -১

0

কাজী আবুল মনসুর :

মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশ থেকে রোহিংগাদের ফেরতে নিতে এবং মিয়ানমার যেন রোহিংগা’দের নাগরিকত্ব দেয় তার জন্য মিয়ানমারের গনতন্ত্র কন্যা ‘অং সান সূচি’কে অনুরোধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে চীনও মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে বলবে বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে কথা দেন। জাতীসংঘ সক্রিয় রয়েছে বিষয়টি নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাখাইনকে বাংলাদেশের সাথে সংযুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্ত কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝে চলমান বড় সমস্যার নাম রোহিংগা। তারা না বাংলাদেশের নাগরিক, না মিয়ানমারের। বিশাল সংখ্যক রোহিংগা জনগোষ্ঠি এখন আন্তজার্তিক সমস্যা। এ সমস্যার শেষ নেই।
রোঁয়াই, রোহিঙ্গা এবং রোসাঙ্গ শব্দগুলো পরিমার্জিত হয়ে বাঙালি কবিদের কাছে রোসাঙ্গ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের কাছে রোয়াং হিসেবে পরিচিত হয়েছে। রোয়াং কিংবা রোসাঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ নানা মত পোষণ করে থাকেন। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করে থাকেন, ‘আরাকানের পূর্বতন রাজধানী ম্রোহং শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াং, রোহাংগ, রোসাংগ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের মানুষদের কাছে, এমনকি আরাকানের রোহিঙ্গাদের কাছে  ম্রোহং পাথুরী কিল্লা বলে পরিচিত।
১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে নরমিখলা নামে আরাকানের জনৈক যুবরাজ মাত্র ২৪ বছর বয়সে পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজধানী ছিলো লেম্ব্রো নদীর তীরে লংগ্রেত। সিংহাসনে আরোহণ করেই নরমিখলা একজন দেশীয় সামন্তরাজার ভগ্নিকে অপহরণ করে রাজধানী লংগ্রেতে নিয়ে আসেন। ফলে আরাকানের সামন্তরাজাগণ একত্রিত হয়ে বার্মার রাজা মেঙশো আইকে আরাকান দখল করার জন্য অনুরোধ জানান। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আক্রমণ করলে নরমিখলা পালিয়ে তদানিন্তন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। তখন ইলিয়াস শাহী রাজবংশ গৌড় থেকে বাংলা শাসন করতো।
জনশ্র“তি রয়েছে, নরমিখলা গৌড়ে এসে সুফী হযরত মুহম্মদ জাকির (র.) নামক জনৈক বিখ্যাত কামিল ব্যক্তির দরবার শরীফ-এ আশ্রয় নেন। নরমিখলা সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরকাল গৌড়ে অবস্থান করেন এবং ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা ও রাজনীতি অধ্যয়ন করেন। চব্বিশ বছর পর ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন শাহ মতান্তরে জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে বিশ হাজার সৈন্যবাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে স্বীয় রাজ্য আরাকান উদ্ধারের জন্যে সাহায্য করেন।
উল্লেখ্য, নরমিখলা ইতোমধ্যে নিজের বৌদ্ধনাম বদলিয়ে মুহম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ফলে বার্মার ইতিহাসে তিনি মুহম্মদ সোলায়মান (মংস মোয়ান) হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। গৌড়ীয় সৈন্যের সহায়তায় নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ আরাকান অধিকার করে ম্রাউক-উ নামক এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। আর এ সাথে শুরু হয় বঙ্গোপসাগর উপকুলে এক শ্রেষ্ঠ সভ্যতার। আরাকান নিশ্চিতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে, একটি আধুনিক সভ্যতার সাথে এই সম্পর্ক আরাকানে এনে দেয় এক রেনেসাঁ। আরাকানী জাতির এক মহাযুগ শুরু হয়।


৪৩০ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ আরাকান অধিকার করার এক বছরের মধ্যে ওয়ালী খান বিদ্রোহ করে নিজেই আরাকান দখল করে নেয়। পরে গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি সিন্ধিখানের নেতৃত্বে আবার ত্রিশ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে সোলায়মান শাহকে (নরমিখলা) সাহায্য করলে রাজ্য ফিরে পান। সিন্ধি খানের নামে একটি মসজিদ এখনো ম্রোহং বা পাথুরী কিল্লাতে রয়েছে। অতঃপর সকল গৌড় থেকে আগত সৈন্যরা আরাকানেই বিশেষ রাজকীয় আনুকুল্যে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধি খানের সহযোগিতায় সোলায়মান শাহ পিতার রাজধানী লংগ্রেত থেকে ম্রোহং নামক স্থানে স্বীয় প্রতিষ্ঠিত ম্রাউক-উ বংশের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান গৌড়ের সুলতানদের কর প্রদান করতো। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগে সোলায়মান শাহর দ্বাদশতম অধঃস্তন পুরুষ জেবুক শাহ (মিনবিন) -এর সিংহাসনে আরোহণ করে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা এবং জেবুক শাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্রাউক-উ-সাম্রাজ্য।

উল্লেখ্য, ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শেখের কিছু কাল বাদ দিলে আরাকান ম্রাউক-উ রাজবংশের শাসনাধীন ছিলো। এ সময়ে প্রায় প্রত্যেক রাজা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সাথে একটি মুসলিম নাম ব্যবহার করেছেন। ফারসী সরকারি ভাষা হিসেবে চালু হয়। গৌড়ের মুসলমানদের অনুকরণে মুদ্রা প্রথার প্রবর্তন হয়। মুদ্রার একপিঠে রাজার মুসলিম নাম ও অভিষেক কাল এবং অপরপিঠে মুসলমানদের কালিমা শরীফ আরবী হরফে লেখা হয়।  রাজার সৈন্যবাহিনীতে অফিসার থেকে সৈনিক পর্যন্ত প্রায় সবাইকে মুসলমানদের মধ্য থেকে ভর্তি করানো হতো। মন্ত্রী পরিষদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলো। কাজী নিয়োগ করে বিচারকার্য পরিচালিত হতো। অপর এক রাজা সেলিম শাহ বার্মার মলমিন থেকে বাংলার সুন্দরবন পর্যন্ত বিরাট ভূভাগ দখল করে দিল্লির মোঘলদের অনুকরণে নিজেকে বাদশাহ উপাধিতে ভূষিত করেন। নিঃসন্দেহে তদানিন্তন শ্রেষ্ঠ সভ্যতা তথা মুসলিম আচার-আচরণ অনুকরণে এসে আরাকানের সমাজ জীবন পরিচালিত হয়েছে সুদীর্ঘ প্রায় চারশ’ বছরকাল। যাকে রোসাঙ্গ সভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
এদিকে খ্রিস্টীয় ৮ম/৯ম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করতো। উজালী ছিলো এ বংশের রাজধানী। বাংলা সাহিত্যে যা বৈশালী নামে খ্যাত। এ বংশের উপাখ্যান রাদ জা’তুয়ে’তে নিম্নরূপ একটি আখ্যান উল্লেখ আছে। কথিত আছে, এ বংশের রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিস্টাব্দ) কয়েকটি বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে এসে ভিড়লে পর রাজা তাদের উন্নততর আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করান। আরবীয় মুসলমানগণ স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জনশ্রুতি আছে, আরবীয় মুসলমানেরা ভাসতে ভাসতে কুলে ভিড়ার পর ‘রহম’ ‘রহম’ ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে।  বলাবাহুল্য, ‘রহম’ একটি আরবী শব্দ। যার অর্থ ‘দয়া করা’। কিন্তু জনগণ মনে করে এরা রহম জাতির লোক। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে থাকেন। সুপ্রসিদ্ধ আরব ভৌগোলিক সুলায়মান ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখ; নামক গ্রন্থে বঙ্গোপসাগরের তীরে রুহমী নামক একটি দেশের পরিচয় দিয়েছেন। যাকে আরাকানের সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে করা যেতে পারে।
কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় শাহপরীর দ্বীপ বলে একটি স্থান রয়েছে। টেকনাফের অদূরে আরাকানের মংডু শহরের সন্নিকটস্থ সুউচ্চ দুটি পাহারের ছড়ার একটির নাম হানিফার টংকী এবং পাশ্ববর্তী অপরটি কায়রা পরীর টংকী বলে খ্যাত। আরাকানে জনশ্র“তি আছে, ইয়াজীদের দ্বন্ধ হওয়ার কারণে ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলীর (রা.) ছেলে হযরত মুহম্মদ হানিফা (র.) আরাকানে আসেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার পর ইতিহাসে হযরত মুহম্মদ হানিফা (র.) সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কিছু জানা যায়নি। অপরদিকে বঙ্গোপসাগর উপকুল হতে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া পর্যন্ত তৎকালীন সময়ের পূর্ব হতেই আরব বণিকদের যোগাযোগ থাকার প্রমাণ ইতিহাসে যথেষ্ট রয়েছে।


কক্সবাজার জেলায় বসবাসকারী জনগণ সাধারণত নিজেদের আরব বংশোদ্ভুত বলে মনে করে থাকেন। এই এলাকার জনগণের ভাষায় ক্রিয়াপদের পূর্বে না সূচক শব্দ ব্যবহার আরবী ভাষার প্রভাবের ফল বলে পন্ডিতগণের ধারণা। কক্সবাজারের মানুষের ভাষায় আরবী ও ফারসী শব্দ এবং মঘী শব্দের আধিক্য দেখা যায়। মঘী জরিপের অনুরূপ অত্র এলাকার জমির পরিমাণ দ্রোন, কানি ও গন্ডা ইত্যাদি হিসেবে হয়ে থাকে। অপরপক্ষে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে গৌড়ীয় পরিমাপ অনুসারে বিঘা, কাঠা ও পাখি হিসেবে হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে কক্সবাজারের মানুষের উপর এটি রোসাঙ্গ সভ্যতার প্রভাবের ফল। অনেক ডাক ও পর্তুগীজ শব্দও এখানকার মানুষের ভাষায় পরিলক্ষিত হয়। আরো দেখা যায়, পর্তুগীজ নাম ফারনানডেজ বিকৃত হয়ে পরান মিয়া, ম্যানুয়েল বিকৃত হয়ে মনু মিয়া হয়েছে।
অনেক ডাচ পর্তুগীজ সন্তান ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে- এমন ঘটনা নিয়ে একটি গল্প ডাচ ইতিহাসে পাওয়া যায়। ঘটনাটি হলো- আরাকানের ম্রাউক-ই রাজবংশের রাজত্বকালে কোন বিদেশী ইচ্ছা করলে আরাকানী রমণীদের বিয়ে করতে পারতো। কিন্তু আরাকান থেকে চলে যাওয়ার সময় আরাকানী স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যেতে পারতো না। আরাকানে অবস্থানরত ডাচগণের ফেলে যাওয়া সন্তান-সন্তুতি মুসলমান হয়ে যায় বিধায় চলে যাওয়ার সময় বড় বড় মটকায় স্ত্রী-পুত্রদের লুকিয়ে আরাকান থেকে নিয়ে যেত। এ ঘটনাটি নিঃসন্দেহে তদানিন্তন আরাকানের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থান কেমন ছিল তা জানতে আমাদের সাহায্য করে। অর্থাৎ ইসলামই ছিলো তৎকালীন আরাকানের সমাজ জীবনে মূল প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি। মহাকবি আলাওল পদ্মাবতী কাব্যে রোসাঙ্গের জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন, “নানাদেশী নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে। আরবী, মিশরী, সামী, তুর্কী, হাবসী ও রুমী, খোরসানী, উজবেগী সকল। লাহোরী, মুলতানী, সিন্ধি, কাশ্মীরী, দক্ষিণী, হিন্দি, কামরূপী আর বঙ্গদেশী। বহু শেখ, সৈয়দজাদা, মোগল, পাঠান যুদ্ধা রাজপুত হিন্দু নানাজাতি। (পদ্মাবতী : আলাওল)
আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি, এখন তারাই একশ্রেনীর সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে।
সন্দেহের অবকাশ নেই যে, রোহিঙ্গারাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ রোসাঙ্গ সভ্যতার ধারক বাহক। তবে এটুকু বলা চলে, নানা জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই রোহিঙ্গা জাতি। বর্তমানে মিয়ানমারের অন্তর্গত আরাকান প্রদেশ ছিল একটি সুপ্রাচীন আলাদা দেশ। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা আরাকান দখল করে নেওয়ার পর আরাকানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগরা পালিয়ে আসে। এটাই যুক্তিসঙ্গত যে, বৌদ্ধদের সাথে সাথে মুসলমানরাও লাঞ্ছিত হতে থাকে। কোন স্থানে দুর্যোগ আসলে উক্ত এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেকে অনুরূপ অত্যাচারের শিকার হতে বাধ্য।
মোঘল, তিব্ব্ত, ভ্রহ্ম ও বহু উপজাতি সহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রাচীন আরাকান গঠিত। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মরাজ বোধপায়া স্বাধীন আরাকান রাজ্যে দখল করে ব্রহ্মদেশের অন্তর্ভুক্ত করে। সে থেকে মূলত এ ভূখন্ডে রোহিঙ্গা সমস্যা, বর্মী সৈন্যরা আরাকানের গ্রাম গ্রামান্তরে মুসলমানদের একত্রিত করে যত সম্ভব হত্যা করে। বর্মী সেনাদের অত্যাচার নির্যাতন সম্পর্কে তৎকালীন আরাকানী সর্দার অ্যাপোল-এর জবানীতে জানা যায়, বর্মী সেনারা নির্বিচারে ২ লাখ আরাকানীকে হত্যা করে এবং সমসংখ্যক দাস হিসেবে বার্মায় প্রেরণ করে। বর্মী রাজ্যের এ ধরনের নির্যাতন, খুন, হত্যা-নিপীড়নের ফলে তারা আরাকান রাজ্যের সন্নিকটস্থ কক্সবাজারে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ বিষয়ে হেয়াল্টার হেমিল্টন লিখেছে যে, সে ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে রামুর শরণার্থী শিবিরে লক্ষাধিক আরাকানী শরণার্থীর অবস্থান দেখেছে।
বার্মার রাজা আরাকান দখল করার পর মগদের সাথে সাথে মুসলমানরাও চলে আসে। তবে তফাৎ হলো মগেরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় গভীর জঙ্গলে আর মুসলমানেরা সমুদ্র পথে হিজরত করে এসে আশ্রয় নেয় স্বধর্মীয় চট্টগ্রামের মুসলমানদের কাছে। আরাকান থেকে আগত মুসলমান স্থানীয় মুসলমানদের কাছে এক বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং এখান থেকেই শুরু হয় অতীতের রোঁয়াই ও চাড়িগ্রাই (চট্টগ্রামী) দুই জনগোষ্ঠীর বিবাদের ইতিহাস।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রোঁয়াই শব্দটি রোসাঙ্গ হতে অভিন্ন। একই এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন দুই ধরনের ভাষা হতে পারে না। যেমন একজন উখিয়া থানার বসবাসকারী লোককে একজন মহেশখালী থানায় বসবাসকারী লোক থেকে চেহারার কারণে পৃথক করে নেয়ার উপায় নেই। তবে একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে লোকটির পূর্বপুরুষ রোঁয়াই নাকি চাড়িগ্রাই (চট্টগ্রামী)। আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, বাঁশখালী থানার কোন লোককে রাউজান থানার কোন লোক থেকে চেহারার জন্যে আলাদা করে নেয়া যাবে না। কিন্তু বাঁশখালীর চট্টগ্রামী কোন পল্লীর লোককে রোঁয়াই পল্লীর লোক থেকে ভাষার কারণে আলাদা করে নেয়া যাবে।
১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। তারা থেকে যায় ভাগ্য বিড়ম্বিত। স্বাধীন দেশের সরকার তাদেরকে নাগরিকত্ব দূরে থাক মানবিক অধিকারটুকুও দেয়নি।
সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও বৌদ্ধদের হামলার শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোন সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। রাখাইন বৌদ্ধদের সেখানে এনে মুসলিমদের সংখ্যালঘু বানানো হয়েছে। সেই ১৯৮২ সাল থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু বলে ঘোষণা করে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এরা বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালি আদিগোষ্ঠী। এদের সঙ্গে মিয়ানমারের কোন সম্পর্ক নেই। সে মতামত প্রতিষ্ঠা করতে মিয়ানমার সরকার তাদের উপর এমন অমানবিক নির্যাতন চালায়, যাতে করে তারা দেশ ছেড়ে পালায় অথবা দাসত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। এদের এ নাজুক পরিস্থিতি দেখে মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ারস বলেছে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা। এছাড়া সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের সব মিলিয়ে ১৩৫টি আদিবাসী গোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলেছে। তবে বৌদ্ধ ধর্মান্ধ সামরিক জান্তাদের চোখে রোহিঙ্গা মুসলমানরা ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীতে পরিগণিত হয়।
ফলে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় মুসলমান আদিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ঠেকাতে তাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত পুড়িয়ে দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের সাধারণত স্থানীয়ভাবে ‘কালারস’ নামে অভিহিত করা হয়। বছর দুয়েক আগে দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের ‘দ্য ভয়েস’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। সেখানে একজন পাঠক তার মতামত দিতে গিয়ে লিখেছে, আমাদের উচিত কালারস হত্যা করা অথবা ধ্বংস করা, তা না হলে এ দেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্ব মুছে যাবে। এমন উদ্ধৃতি থেকে সহজেই বোঝা যায়, বার্মিজ ও রোহিঙ্গারা ধর্মগত দিক থেকে দ্বান্ধিক ও পৃথক সত্তার অধিকারী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজরা চায় সেখানে বৌদ্ধদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। সে মতবাদের আলোকে রোহিঙ্গারা ক্ষুদ্র ও ভিনদেশী বলে পরিচিত। দেশটির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায়ও তাদের কোন স্থান নেই বলে বিশ্বাস করে সরকার। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে মিয়ানমার বিদ্বেষী ও বৌদ্ধদের শত্রু হিসেবে। শুধু তাই নয়, জাতীয়তার প্রশ্নে তাদের হিসেবে ধরা হয় না। অর্থাৎ অভিন্ন পতাকার তলে মিয়ানমারের জাতীয়তার স্বীকৃতি পায়নি তারা। ফলে যাযাবরের জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। (চলবে)

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.